‘শিক্ষার্থীদের কাজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, রাস্তায় কী?’
১১ জুলাই ২০২৪ ২২:০৭
চট্টগ্রাম ব্যুরো: মোতালেব মিয়া ভাড়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান। অটোরিকশা চালিয়ে দিনশেষে যে টাকা উপার্জন করেন তার একটি অংশ দিয়ে দিতে হয় গাড়ির মালিককে। এরপর গাড়িতে গ্যাস ভরে যে টাকা অবশিষ্ট থাকে সেটা দিয়েই কোনোভাবে পরিবার নিয়ে জীবন দিনাতিপাত করেন।
কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করায় গত তিনদিন ধরে গাড়িতে যাত্রীই তুলতে পারছেন না মোতালেব মিয়া। ভাড়া না পাওয়ায় মহাজনের ভাড়াও কীভাবে দেবেন সে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন তিনি।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর দুই নম্বর গেইট এলাকার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এতে সৃষ্টি হওয়া তীব্র যানজটে ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। গাড়ি না পেয়ে অনেককেই ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীদেরকে গালমন্দ করতেও দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে অনেকে যৌক্তিক বললেও রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলনে তারা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
মোতালেব মিয়া নামে এক সিএনজি অটোরিকশা চালক সারাবাংলাকে বলেন, ‘ছাত্ররা থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। রাস্তায় তাদের কী কাজ। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা রাস্তা বন্ধ করে আমাদের পেটে লাথি মারছে। দুপুরে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে শুধু দুইটা ভাড়া পেয়েছি। রাস্তা বন্ধ দেখে এক যাত্রী অর্ধেক ভাড়া দিয়েই নেমে হেঁটে চলে গেছে। দুই ঘণ্টা ধরে গাড়ি এক জায়গায় দাঁড়ানো।’
রায়হান মারুফ নামে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, ‘তাদের আন্দোলনে সমর্থন আছে আমার। তবে এভাবে ঘন্টার পর ঘণ্টা রাস্তা ব্লক করে কীসের আন্দোলন। তারা আদালতে গিয়ে লড়াই করুক। এখানে রাস্তা বন্ধ করে তারা সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। অফিস থেকে বের হয়ে ১৫ মিনিট ধরে হাঁটছি। সব দিক দিয়ে গাড়ি বন্ধ।’
এর আগে দুপুর আড়াইটার ট্রেনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শাটল ট্রেনে করে নগরীর বটতলী রেলস্টেশনে আসেন শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে চবি অধিভুক্ত বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেয়। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রেলস্টেশন থেকে টাইগারপাস মহাসড়ক অবরোধের জন্য গেলে পুলিশ তাদের পথরোধ করে। আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে তাদের হাতাহাতি হয়। এরপর পুলিশ ধাওয়া দিলে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

পরে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে দুই নম্বর গেইট এলাকায় গিয়ে সেখানেই অবস্থান নেন। এসময় তারা রোগী পরিবহণকারী অ্যাম্বুলেস ছাড়া আর কোনো গাড়ি রাস্তায় চলাচল করতে দেননি। পুলিশের গাড়িও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে রেহাই পায়নি। সাড়ে তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করার পর রাত আটটায় শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে ষোলশহর রেলস্টেশনে গিয়ে সেখানেই কর্মসূচি শেষ করেন।
এদিকে টানা সাড়ে তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ থাকার কারণে নগরীর দুই নম্বর গেইট, জিইসি, মুরাদপুর ও প্রবর্তকসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে যায়। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশ ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী।
এদিকে সন্ধ্যা সাতটার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ সাংবাদিকদের কটুক্তি করে তাদের উদ্দেশ্যে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন।
আন্দোলনের সমন্বয়ক মোহাম্মদ রাসেল আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার শান্তিপুর্ণভাবেই মিছিল নিয়ে টাইগারপাসের দিকে যাচ্ছিলাম। পুলিশ আমাদের পথরোধ এবং লাঠিচার্জ করে। এতে আমাদের তিন থেকে চারজন গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আমরা কোনো সহিংস আন্দোলন করছি না। শান্তিপুর্ণ আন্দোলন করছি। আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না।’
আগামীকাল (শুক্রবার) বিকেল সাড়ে চারটায় ষোলশহর স্টেশনে জমায়েত হবে বলে জানিয়েছেন রাসেল আহমেদ।
পাঁচলাইশ জোনের সহকারি কমিশনার (এসি) আরিফ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে শিক্ষার্থীরা দুই নম্বর গেইটের সড়ক অবরোধ করেন। শান্তিপূর্ণভাবেই তারা তাদের কর্মসূচি করেছে। অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে আমরা সবকিছু নজরদারিতে রাখছি।’
এদিকে কোটা সংস্কারের দাবিতে চট্টগ্রামে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় পুলিশের বাধা দেওয়ার ঘটনায় চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
সারাবাংলার চবি করেসপন্ডেন্ট মোস্তাফিজুর রহমান রাফি জানিয়েছেন, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে চট্টগ্রাম – খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন একদল শিক্ষার্থী। এসময় দুইদিক থেকেই যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। রাত সাড়ে আটটার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়ক ছাড়ার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
সারাবাংলা/আইসি/একে
কোটাবিরোধী আন্দোলন চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম নগর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চবি টপ নিউজ